বেসরকারি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ২৭০ পাউন্ড ব্যয়, রক্ত পরীক্ষার ফল নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে চার মাসেরও বেশি অপেক্ষা। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও করের অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফাইন্যানশিয়াল অ্যাডভাইজর মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর স্বাস্থ্যসেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, পরীক্ষার ফল নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শে বিলম্ব এবং বেসরকারি চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লন্ডনপ্রবাসী ফাইন্যানশিয়াল অ্যাডভাইজর মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান। দৈনন্দিন জীবনে বিপুল কর দেওয়ার পরও রোগীদের সময়মতো সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, ৪০ বছর পেরোনোর পর এনএইচএসের আওতায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাঁর জিপি থেকে একাধিকবার বার্তা এলেও প্রথমদিকে তিনি তেমন গুরুত্ব দেননি। পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রক্ত পরীক্ষা করান। তবে এক সপ্তাহ পার হলেও পরীক্ষার ফল নিয়ে কোনো খবর না পেয়ে তিনি নিজের খরচে বেসরকারিভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, বেসরকারি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর খরচ হয় ১৫০ পাউন্ড এবং বিস্তারিত রক্ত পরীক্ষায় আরও ১২০ পাউন্ড। মোট ২৭০ পাউন্ড ব্যয়ে তিনি তিন পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন পান। সেখানে রক্তের বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা ও স্বাভাবিক সীমার বাইরে থাকা ফলাফল উল্লেখ করা হয়।
বেসরকারি পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে জিপির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁকে জানানো হয়, আগের পরীক্ষাটি পূর্ণাঙ্গ রক্ত পরীক্ষা ছিল না। পরে আবার রক্ত পরীক্ষা করা হয় এবং চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় দেওয়া হয় প্রায় দুই মাস পর। নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি আবারও ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রায় এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার কথা জানানো হয়।
লেখকের দাবি, প্রথম রক্ত পরীক্ষা থেকে চার মাসেরও বেশি সময় পার হলেও তখন পর্যন্ত তিনি চূড়ান্ত ফলাফল ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি।
তিনি উল্লেখ করেন, ইংল্যান্ডে ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী ব্যক্তিদের সাধারণত পাঁচ বছর পরপর এনএইচএস হেলথ চেকের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে এই পরীক্ষা পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের মতো অসুস্থতার ঝুঁকি মূল্যায়ন করা।
করের অর্থ ও স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এনএইচএস ব্রিটেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা প্রতিষ্ঠান। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও একজন রোগীকে পরীক্ষার ফল নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হলে, সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তিনি উদাহরণ হিসেবে বছরে ৩৯ হাজার পাউন্ড বেতন পাওয়া একজন কর্মীর আয়কর ও ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্সের হিসাব তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রত্যক্ষ করের পাশাপাশি ভ্যাট, জ্বালানি কর ও কাউন্সিল ট্যাক্সের মতো বিভিন্ন করের মাধ্যমে নাগরিকেরা রাষ্ট্রের রাজস্বে অবদান রাখেন। বিনিময়ে তাঁরা সময়মতো ও কার্যকর জনসেবা প্রত্যাশা করেন।
তাঁর প্রশ্ন, এনএইচএসের দীর্ঘ অপেক্ষার পেছনে অর্থের ঘাটতি, চিকিৎসক ও কর্মীর সংকট, নাকি ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা কাজ করছে? বিপুল বাজেট বরাদ্দের পরও রোগীর কাছে যথাসময়ে সেবা পৌঁছানো কেন কঠিন হয়ে পড়ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বেসরকারি চিকিৎসার সামর্থ্য সবার নেই
লেখায় তিনি আরও বলেন, নিজের অর্থ খরচ করে বেসরকারি পরীক্ষা করানোর সামর্থ্য সবার নেই। নিম্ন আয়ের মানুষ বা সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া ব্যক্তিদের জন্য দীর্ঘদিন চিকিৎসকের অপেক্ষায় থাকা আরও কঠিন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসায় বিলম্ব রোগীর জন্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
তবে তাঁর প্রশ্ন এনএইচএসের চিকিৎসক বা নার্সদের বিরুদ্ধে নয়; বরং পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। এনএইচএসকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বরাদ্দ করা অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং রোগীরা তার সুফল সময়মতো পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
লেখাটির শেষাংশে মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় একজন সাধারণ নাগরিক কেন নিজের পরীক্ষার ফল ও চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করবেন।
মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান: ফাইন্যানশিয়াল অ্যাডভাইজর, লন্ডন, যুক্তরাজ্য।





