স্টাফ রিপোর্ট:
দীর্ঘ চরাই-উতরাই, দমন-পীড়ন আর প্রতিকূল সময় পেরিয়ে অবশেষে নতুন আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি। সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখার পর আবারও সংগঠনটি ফিরে আসছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নতুন কমিটি গঠনের সম্ভাবনাকে ঘিরে এখন সর্বত্র চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
জানা যায়, ২০১৮ সালে গঠিত আংশিক কমিটি এবং ২০২১ সালে অনুমোদিত পূর্ণাঙ্গ কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন প্রেক্ষাপটে নতুন নেতৃত্ব আসেনি এতদিন। ফলে তৃণমূলের মধ্যে জমে ছিল এক ধরনের অপেক্ষা-যেন সঠিক সময়ের অপেক্ষা। সেই সময়টিই যেন এসেছে এখন।
এক সময় স্থবির হয়ে পড়া সংগঠনটি নানা সংকট, হামলা-মামলা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে টিকে ছিল কেবল ত্যাগী নেতাকর্মীদের দৃঢ়তায়। দীর্ঘদিন নতুন কমিটি না হওয়ায় হতাশা তৈরি হলেও সেই অন্ধকার যেন ভেঙেছে আন্দোলনের উত্তাপে। বিশেষ করে জুলাইয়ের গণআন্দোলনে মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নতুন আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে।
এখন চায়ের টেবিল থেকে ক্যাম্পাস, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সবখানেই সম্ভাব্য কমিটি নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ, হিসাব-নিকাশ আর নানামুখী আলোচনা। পদপ্রত্যাশী নেতাদের সমর্থকরাও বসে নেই। তারা তুলে ধরছেন নিজেদের প্রার্থীর ত্যাগ, সাহসিকতা আর আন্দোলনের ইতিহাস।
নতুন কমিটিকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। আলোচনায় রয়েছেন একাধিক পরিচিত মুখ। যারা বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন সামনের সারিতে। কেউ হামলার শিকার হয়েছেন, কেউ কারাবরণ করেছেন, আবার কেউ নেতৃত্ব দিয়েছেন কঠিন সময়ের কর্মসূচিতে।
প্রার্থীদের বক্তব্যে উঠে আসছে দুঃসময়ের গল্প, সাহসিকতার স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। তাদের প্রত্যাশা- এইবার মূল্যায়ন হবে ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার ভিত্তিতে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ঝুঁকি নিয়ে সংগঠনকে সচল রেখেছেন। তাদেরই সামনে আনা উচিত।
সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য আলোচনায় রয়েছেন নতুন কমিটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন: জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক আব্দুস সামাদ লস্কর মুনিম, মহানগর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রুবেল ইসলাম, মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম-সম্পাদক আজহার আলী অনিক, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-সম্পাদক শহিদুল ইসলাম অপু, মহানগর ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন, সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক সেলিম আহমদ সাগর, মদনমোহন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক আফজাল হোসেন, সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক তানভীর আহমদ খান, মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম-সম্পাদক জহিরুল ইসলাম আলাল, জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক খালেদুর রহমান সানি, মহানগর ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক মাহবুব হোসেন এবং মদন মোহন কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শাহান আল মাহমুদ খান।
সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নতুন কমিটিকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে তীব্র প্রতিযোগিতা। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা এবং সংগঠনের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা- এসব বিষয়কে সামনে এনে নিজেদের যোগ্যতার বার্তা দিচ্ছেন নেতারা। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে দুঃসময়ের সাহসিকতা, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতে সংগঠনকে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। তৃণমূলের প্রত্যাশাও এমন নেতৃত্ব, যারা মাঠপর্যায়ে পরীক্ষিত এবং সংগঠনের জন্য নিবেদিত।
জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক আব্দুস সামাদ লস্কর মুনিম জানান, ছাত্ররাজনীতির কারণে তাকে বারবার হামলার মুখে পড়তে হয়েছে, এমনকি তার পরিবারও রেহাই পায়নি। তবুও তিনি সংগঠন থেকে সরে যাননি। তার মতে, “ত্যাগ ও ধারাবাহিকতাই একজন প্রকৃত নেতার পরিচয়।”
মহানগর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রুবেল ইসলাম তার রাজনৈতিক জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, বিগত সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে একাধিক মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে দেশব্যাপী দমন-পীড়নের সময় তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং জামিনে থাকার পরও পুনরায় আটক করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় কারাবন্দী থাকতে হয়েছে। তিনি বলেন, এসব অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক জীবনকে আরও দৃঢ় করেছে এবং সংগঠনের প্রতি তার অঙ্গীকারকে শক্তিশালী করেছে।
এমসি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক সেলিম আহমদ সাগর তার বক্তব্যে নিজেকে একজন পরীক্ষিত ও মাঠপর্যায়ের সংগঠক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “দলের দুঃসময়ে ক্যাম্পাস রাজনীতি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমসি কলেজ ও টিলাগড় এলাকায় প্রতিনিয়ত হামলা-মামলার ঝুঁকি থাকলেও আমি দায়িত্ব পালন থেকে সরে আসিনি। আহ্বায়ক হিসেবে প্রতিটি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে কর্মীদের সঙ্গে মাঠে থেকেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতিকে নিয়ে এসে দীর্ঘ ২১ বছর পর এমসি কলেজে সম্মেলন আয়োজন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে সক্ষম হই। এই পুরো সময়জুড়ে নানা চাপ ও ঝুঁকির মধ্যে থেকেও সংগঠনকে ধরে রেখেছি। আমার কাছে পদ নয়, দায়িত্বই মুখ্য-সংগঠনের প্রতিটি কর্মীর আস্থা অর্জন এবং একটি শক্তিশালী ইউনিট গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য।”
নতুন কমিটি গঠনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই চলমান রয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, খুব শিগগিরই ত্যাগী, নির্যাতিত ও পরীক্ষিত নেতাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কমিটি ঘোষণা করা হবে।