যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের নাটকীয় সাফল্য এবং এর ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) খাতের দ্রুত প্রসারে সম্ভাব্য কড়াকড়ির আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের রক্তক্ষরণ ও ধস নেমেছে। মার্কিন বাজার খোলার আগের মুহূর্তগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, তা ইউরোপ ও এশিয়ার পুঁজিবাজারকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
১. একদিনেই ট্রিলিয়ন ডলার উধাও: মার্কিন বাজারে ঐতিহাসিক পতন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ‘ন্যাসডাক’ (Nasdaq) গত বৃহস্পতিবার এক ধাক্কায় ৫.৫ শতাংশের বেশি দরপতনের মুখে পড়ে, যা গত দেড় বছরের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম পতনের রেকর্ড গড়েছে। এই আকস্মিক ধসের ফলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সাতটি প্রযুক্তি জায়ান্ট—যাদের সম্মিলিতভাবে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ বলা হয়, তাদের বাজারমূল্য থেকে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে প্রায় এক ট্রিলিয়ন (এক লক্ষ কোটি) ডলার উধাও হয়ে গেছে। এর মধ্যে এআই খাতের মূল চাবিকাঠি ও মাইক্রোচিপ সরবরাহকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার শেয়ারদর ৯ শতাংশের বেশি কমে যায়। পাশাপাশি, ইলন মাস্কের টেসলা এবং স্পেসএক্সের শেয়ারদর যথাক্রমে প্রায় ১১ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ পতনের শিকার হয়।
২. এশিয়া ও ইউরোপের পুঁজিবাজারে মারাত্মক প্রভাব
মার্কিন বাজারের এই অস্থিরতা দ্রুত সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে। এশিয়ার বাজারে জাপানের নিকেই (Nikkei 225) সূচক ৬ শতাংশের বেশি দরপতন নিয়ে লেনদেন শেষ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি (Kospi) সূচক এতটাই নাটকীয় পতনের মুখোমুখি হয় যে, বাজারে আতঙ্কজনক বিক্রি বা ‘প্যানিক সেলিং’ ঠেকানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে ‘সার্কিট ব্র্রেকার’ বা সাময়িক লেনদেন স্থগিতের ব্যবস্থা চালু করতে হয়। অন্যদিকে, ইউরোপের প্রধান বাজারগুলোতেও এর বড় ধরনের ধাক্কা লাগে; জার্মানির ড্যাক্স, ফ্রান্সের সিএসি ৪০ এবং যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক অন্তত দুই শতাংশ বা তার বেশি পতনের শিকার হয়।
৩. মধ্যবর্তী নির্বাচন, ডেটাসেন্টার বিতর্ক ও জনরোষ
মূলত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অপ্রত্যাশিত জয়ই এই টালমাটাল পরিস্থিতির মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা অতি দ্রুত গতিতে গড়ে ওঠা বিশাল আকৃতির ডেটাসেন্টারগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নতুন পরিবেশগত নিয়ম এবং প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন কর সুবিধা বাতিলের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে (যেমন টেক্সাস বা অ্যারিজোনা) অপরিকল্পিত ও দ্রুত ডেটাসেন্টার নির্মাণের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা বিদ্যুৎ সংকট, পানির অপচয় ও পরিবেশগত ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন। ভোটারদের এই গভীর অসন্তোষ ব্যালটে প্রতিফলিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন যে, আগামী দিনে এআই খাতের সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো নির্মাণ উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হয়ে পড়বে।
৪. মার্কিন রাষ্ট্রপতির তীব্র প্রতিক্রিয়া
বাজারের এই ধসের মুখে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ (SI) হিসেবে উল্লেখ করে বলেন যে, বর্তমান ডেটাসেন্টারগুলো দেশের জন্য ‘স্বর্ণের খনির’ সমান এবং কেবল “বোকা নেতৃত্বই” এ থেকে অর্জিত বিশাল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে ফিরিয়ে দিতে পারে বা ‘না’ বলতে পারে।
৫. বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিগত কয়েক বছর ধরে এআই খাতের পেছনে যে অভাবনীয় ও আকাশচুম্বী বিনিয়োগ হয়েছিল, তাতে বাজারের অতি-মূল্যায়ন বা ‘বুদবুদ’ তৈরি হওয়া অবধারিত ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কেবল সেই বুদবুদে সূঁচ ফুটিয়ে দিয়েছে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী কোনো কাঠামোগত মন্দার ইঙ্গিত নাকি বাজারের একটি স্বাস্থ্যকর সংশোধনী (Correction), তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যদিও ন্যাসডাক সূচক বছরের শুরুর তুলনায় কিছুটা ইতিবাচক অবস্থানে টিকে আছে, তবুও এই আকস্মিক ও তীব্র ঝাঁকুনি বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।





