আরবি ভাষায় শবে বরাতকে বলা হয় ‘লাইলাতুল বরাত’। ‘শব’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে আগত, যার অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ সৌভাগ্য বা মুক্তি। সুতরাং শবে বরাতের অর্থ দাঁড়ায় সৌভাগ্যের রাত। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, এই রাত দোয়া কবুলের রাত। এ রাতে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের গুনাহ ক্ষমা করেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এবং রহমতের দরজা খুলে দেন।
এই মহিমান্বিত রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অতীতের পাপ ও ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনায় মগ্ন থাকেন। তারা নফল নামাজ আদায় করেন, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন, জিকির-আজকারে সময় কাটান এবং ভবিষ্যৎ জীবনের কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন।
অনেক মুসলমান এ দিনে রোজা রাখেন, গোপনে দান-খয়রাত করেন এবং মৃত আত্মীয়-স্বজনের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন। পাশাপাশি আত্মীয়, প্রতিবেশী ও দুঃস্থদের মাঝে হালুয়া, ফিরনি ও নানা ধরনের খাবার বিতরণের প্রচলন রয়েছে। সারারাত ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে শবে বরাত অতিবাহিত করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা।
শবে বরাতের ইতিহাস
ইতিহাসবিদদের মতে, হিজরি ৪৪৮ সনে প্রথম শবে বরাত পালনের প্রচলন শুরু হয়। বর্ণিত আছে, ইবনে আবিল হামরা নামের এক ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী ফিলিস্তিনের নাবলুস শহর থেকে এসে সুন্দর কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। এক রাতে তিনি শাবানের মধ্যরাতে নামাজে দাঁড়ালে ধীরে ধীরে আরও অনেকে তাঁর পেছনে নামাজে শরিক হন। পরবর্তী বছরগুলোতে এই নামাজের ধারা অব্যাহত থাকে এবং একসময় তা মসজিদুল আকসায় প্রচলিত হয়ে যায়। কালক্রমে অনেকে একে সুন্নত হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন।
কোথায় কোথায় শবে বরাত পালিত হয়
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াজুড়ে শবে বরাত ব্যাপক উৎসাহ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ছাড়াও তুরস্ক, আজারবাইজান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কিরগিজস্তানে এই রাত বিশেষ গুরুত্ব পায়। আরব বিশ্বে মূলত সুফি ঐতিহ্যের অনুসারী ও শিয়া মুসলমানরা শবে বরাত পালন করেন। স্থানভেদে এই রাত ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত—ইরান ও আফগানিস্তানে ‘নিম শাবান’, তুরস্কে ‘বিরাত কান্দিলি’ এবং উপমহাদেশে ‘শবে বরাত’ বা ‘নিসফে শাবান’ নামে পরিচিত।
শবে বরাতের খাওয়াদাওয়া ও সামাজিক রীতি
শবে বরাত উপলক্ষে ঘরে ঘরে হালুয়া, ফিরনি, রুটি ও নানা ধরনের খাবার প্রস্তুত করা হয়। এসব খাবার আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। অনেকেই সন্ধ্যার পর কবরস্থানে গিয়ে পূর্বপুরুষ ও আপনজনদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন।
রমজানের প্রস্তুতির বার্তা
শবে বরাতকে মুসলমানরা রমজানের আগমনী বার্তা হিসেবেও বিবেচনা করেন। কারণ, আরবি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী শাবান মাসের পরই আসে পবিত্র রমজান। ফলে এই রাত থেকেই আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাধ্যমে রমজানের প্রস্তুতি শুরু করেন মুসলমানরা।