ইংল্যান্ডে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে গড়ে ৩ শতাংশ পরিবার সংকীর্ণ বাসস্থানে থাকছে। সেখানে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর এই হার প্রায় ১৮ শতাংশ। শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ পরিবারে এ হার মাত্র ২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় কক্ষসংখ্যা ও বাসযোগ্য জায়গার অভাবে বাংলাদেশিরা অনেক বেশি ভুক্তভোগী।
যুক্তরাজ্য সরকারের জাতিগত তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
যুক্তরাজ্য সরকারের জাতিগত তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘনবসতি প্রবীণদের শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ ও পারিবারিক টানাপোড়েন বাড়িয়ে দিচ্ছে।
লন্ডনের বহুতল ভবন আর আলোকোজ্জ্বল নগরচিত্রের আড়ালে গভীর হচ্ছে এই মানবিক সংকট। বসবাসের জন্য একটি ছাদ থাকলেও নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও বয়স উপযোগী আশ্রয় পাচ্ছেন না বহু বাংলাদেশি প্রবীণরা।
ঘনবসতি, নিম্নমানের সরকারি ভাড়া বাসা, উচ্চ ভাড়া ও দারিদ্র্যের চক্র—সব মিলিয়ে জীবনের শেষ দিকে এসে অনেকের জন্য হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তার ও বঞ্চনার গল্প।
আবাসনের ধরনেও রয়েছে স্পষ্ট বৈষম্য। সরকারি তথ্য বলছে, প্রায় ৪০ শতাংশ বাংলাদেশি পরিবার স্থানীয় কাউন্সিল বা আবাসন সমিতির ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। সার্বিক জাতীয় এ হার প্রায় ১৭ শতাংশ। যদিও এসব বাসা তুলনামূলকভাবে কম ভাড়ায় পাওয়া যায়, তবে অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো বয়স্কদের উপযোগী নয়।
লিফটবিহীন ভবন, সংকীর্ণ সিঁড়ি, পর্যাপ্ত তাপের অভাব কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত সুবিধার ঘাটতি প্রবীণদের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলছে কষ্টকর।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও উদ্বেগজনক। আবাসন ব্যয় বাদ দিলে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫৩ শতাংশ নিম্ন আয়ের শ্রেণিতে পড়ে, যেখানে জাতীয় গড় প্রায় ২১ শতাংশ। অর্থাৎ ভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় পর তাঁদের হাতে জীবনযাপনের জন্য খুব সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে। ফলে অনেক প্রবীণ বাধ্য হয়ে সন্তান-সন্ততির সঙ্গে গাদাগাদি করে বাস করেন অথবা অনুপযুক্ত পরিবেশে থাকতে বাধ্য হন।
বয়স ও সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর প্রবীণদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশি পটভূমির প্রবীণরা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি দারিদ্র্য ঝুঁকিতে। বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের একটি বড় অংশ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, হ্যাকনি ও রেডব্রিজ এলাকায় পরিচালিত ‘আমার বাড়ি, আমার জীবন’ শীর্ষক একটি গবেষণায় উঠে এসেছে আরো উদ্বেগজনক তথ্য।
গবেষণার তথ্য বলছে, বাংলাদেশি প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত বয়স উপযোগী ও সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল আবাসনের ঘাটতি রয়েছে। অনেকেই নিজ সম্প্রদায়ের সামাজিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। কারণ উপযুক্ত বাসস্থান না পেয়ে অন্য এলাকায় সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একাকিত্ব ও মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়ছে।
৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনের হাউস অব লর্ডসের চোলমন্ডেলি কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয় পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি প্রবীণদের আবাসন পরিস্থিতি নিয়ে তিন বছরব্যাপী গবেষণা প্রতিবেদন ‘আমার বাড়ি, আমার জীবন’।
প্রধান অতিথি লর্ড বেস্ট গবেষণাটিকে ‘অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সুসংহত ও লক্ষ্যভিত্তিক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি এমন একটি কাজ, যা নীতিনির্ধারক ও সরকারি কর্মকর্তাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাঁর মতে, গবেষণাটি বাস্তব ও অর্থবহ পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
ভিভেনসা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণায় অংশীদার ছিল দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি, বাংলা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন এবং হাউজিং লার্নিং অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট নেটওয়ার্ক। টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, হ্যাকনি ও রেডব্রিজ এলাকায় বসবাসরত ৫০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী ৭৬ জন বাংলাদেশি নারী-পুরুষের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে উঠে এসেছে বাস্তব চিত্র।
অনেক প্রবীণ অভিযোগ করেছেন, কাউন্সিল বা বাড়িওয়ালার কাছে সহায়তা চাইলে তাঁরা ধীর বা অনুপযুক্ত সাড়া পান। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকেই শেষ পর্যন্ত আবেদন করা থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুপযুক্ত পরিবেশেই তাঁদের বসবাস অব্যাহত থাকে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের ওপর কেয়ারের চাপও বাড়ায়।
দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটির বার্ধক্য বিষয়ক সিনিয়র লেকচারার এবং গবেষণার প্রধান গবেষক মানিক গোপীনাথ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বয়স্ক বাংলাদেশিরা বার্ধক্য ও আবাসনসংক্রান্ত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে অদৃশ্য থেকেছেন। এই গবেষণা তাঁদের কণ্ঠকে কেন্দ্রে এনে দেখিয়েছে, বৈষম্য কেবল বিদ্যমান নয়, বরং তা প্রতিদিনের জীবনে কিভাবে অনুভূত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আজীবন বঞ্চনার পরিণতি হিসেবে কিভাবে প্রকাশ পায়।’
বাংলা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের সিইও বশির উদ্দিন বলেন, ‘গবেষণা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়। এটি একটি স্পষ্ট কর্মসূচির আহবান। বিদ্যমান ঘরগুলোকে বাসযোগ্য করে তুলতে প্রয়োজনীয় অভিযোজন নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুন নির্মাণে বড় ও পরিবার উপযোগী বাসস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।’
মাদক ও জুয়াসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে উল্লেখ করে তিনি অবিলম্বে ওসির প্রত্যাহার দাবি করেন এবং প্রশাসনকে বিষয়গুলো তদন্তের আহ্বান জানান।