দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের অনিশ্চয়তা ও টানটান আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে ব্রিটেনে থাকার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন ৪৬ বছর বয়সী বাংলাদেশি মুন্না মিয়া। ব্রিটিশ আদালতের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ের মাধ্যমে তার পক্ষে এই অগ্রগতি এসেছে। সিলেটের এই ব্যক্তির অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জন্যও এটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতির কড়াকড়ির প্রেক্ষাপটে এই রায় আশ্রয়প্রার্থী ও অভিবাসন আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১৯৯৮ সালে সিলেট থেকে গোপনে যুক্তরাজ্যে যান মুন্না মিয়া। প্রায় ১২ বছর তিনি লন্ডনে কর্তৃপক্ষের নজরের বাইরে ছিলেন। ২০১০ সালে প্রথমবার পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ আইনি লড়াই, যা প্রায় ১৪ বছর ধরে চলে।
ব্রিটিশ হোম অফিসের দাবি ছিল, মুন্না ২০১০ সালেই যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন এবং তার আগে সেখানে থাকার কোনো প্রমাণ নেই। তবে আপার টিয়ার ট্রাইব্যুনাল এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। আদালত দীর্ঘ সময় বসবাসের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করে যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রায় তিন দশকের পুরোনো বসবাসের প্রমাণ সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন—যা এই মামলায় মুন্নার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মুন্না মিয়া দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন, তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সক্রিয় কর্মী এবং দেশে ফিরলে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় আসায় তার এই যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ার কথা ছিল, কারণ সাধারণত নিজের দল ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের আশঙ্কা আইনি যুক্তি হিসেবে কম গ্রহণযোগ্য হয়।
তবে মুন্নার আইনজীবীরা মামলায় ভিন্ন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন। তারা দেখান যে, দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে বসবাসের কারণে সামাজিকভাবে তার একীভূত হওয়া এবং হোম অফিসের কিছু প্রক্রিয়াগত ত্রুটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই রায় থেকে বোঝা যায়, অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস ও পারিবারিক সম্পর্ক রাজনৈতিক পরিস্থিতির চেয়েও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
২০২৪ সালের ১৬ মে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের একটি ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। তবে মুন্নার আইনজীবীরা সেই প্রক্রিয়ার জটিলতা এড়িয়ে ২০২৫ সালের এপ্রিল এবং পরে ২০২৬ সালে মামলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ব্রিটিশ সরকারের দ্রুত বহিষ্কার নীতির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য আইনি বাধা তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে মামলাটি পুনরায় শুনানির জন্য ফার্স্ট-টিয়ার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাজ্যের নতুন আশ্রয় নীতিতে প্রতি ৩০ মাস পরপর শরণার্থী মর্যাদা পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে। ফলে মুন্নার মামলাটি সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
এ বিষয়ে লন্ডনের চ্যান্সেরী সলিসিটর্সের প্রধান ব্যারিস্টার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতি থাকলেও দীর্ঘ সময়ের বসবাসের শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা গেলে আইনি লড়াইয়ে জয় পাওয়া সম্ভব।