লন্ডন-ঢাকা রুটে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর একসময়কার অত্যন্ত লাভজনক কার্গো ব্যবসা এখন কার্যত বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর দখলে চলে গেছে। অভ্যন্তরীণ নথি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এমনই চিত্র উঠে এসেছে আমাদের অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন কার্গো এজেন্ট ২০০৯ সাল থেকে এই রুটে ধারাবাহিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি বিমানের কার্গো পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এবং প্রতি ফ্লাইটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করত।
তবে ২০২০ সালে হঠাৎ করেই কোনও দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই ওই কার্গো সেলস এজেন্টের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। চুক্তি বাতিলের আগে প্রতি ফ্লাইটে গড়ে প্রায় ৮ টন কার্গো সরবরাহ করা হলেও তা ধীরে ধীরে কমিয়ে প্রায় ৩ টনে নামিয়ে আনা হয়। এরপর দ্রুত চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
বিমানের বিপণন বিভাগের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই লন্ডন-ঢাকা রুটে কার্গো আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী: ২০১৮-১৯ অর্থবছর: আয় ছিল প্রায় ৪৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছর: আয় নেমে আসে মাত্র ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকায়।
একাধিক অভ্যন্তরীণ সভার কার্যবিবরণীতে এই রাজস্ব পতন নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার পাশাপাশি কার্গো কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশও করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চুক্তি বাতিলের পেছনে প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার এবং একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা যথাযথ তদন্ত ছাড়াই একতরফা প্রতিবেদন দাখিল করেন, যা পরবর্তীতে চুক্তি বাতিলের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আরও জানা যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবও কাজ করেছে। একটি প্রভাবশালী মহলের নির্দেশনা অনুসরণ করেই পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিমানের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এই এক সিদ্ধান্তের কারণে সংস্থাটির মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
এই রুটে দীর্ঘদিন নির্ভরযোগ্য সেবা পাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখন বিকল্প হিসেবে বিদেশি এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এতে একদিকে যেমন সেবার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষয়টি নিয়ে বিমানের লন্ডন কার্যালয়ের বর্তমান দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছে ইমেইলে জানতে চাওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনও জবাব পাওয়া যায়নি।
লন্ডন-ঢাকা রুটে বিমানের কার্গো ব্যবসার এই পতন কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ফল নয়—বরং এর পেছনে রয়েছে নীতি-নির্ধারণী দুর্বলতা, প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের অভিযোগ। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।