যুক্তরাজ্যে ভুয়া তথ্য ও নানা জালিয়াতির আশ্রয়ে অভিবাসন আবেদন বাড়ছে বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দ্রুত ও সহজ উপায়ে স্থায়ী হওয়ার লক্ষ্যে কিছু আবেদনকারী অসাধু পরামর্শদাতাদের সহায়তায় মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করছেন—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে।
BBC-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু আবেদনকারী কৌশলে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে আশ্রয় বা স্থায়ী বসবাসের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার কারণে সরকার অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে কঠোরতা বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন ভিসায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের পর দ্রুত স্থায়ী হওয়ার লক্ষ্যে নিজেদের গৃহ নির্যাতনের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ‘মাইগ্র্যান্ট ভিকটিমস অব ডোমেস্টিক অ্যাবিউজ কনসেশন’ নামের একটি সুরক্ষা ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঝুঁকিও এতে বাড়ছে।
এ ছাড়া, কিছু আবেদনকারী নিজেদের যৌন পরিচয় নিয়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এসব কর্মকাণ্ডে কিছু অসাধু অভিবাসন পরামর্শদাতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অননুমোদিত বা অসৎ পরামর্শদাতারা অর্থের বিনিময়ে আবেদনকারীদের মিথ্যা তথ্য দিতে উৎসাহিত করছেন।
অনলাইন বিজ্ঞাপন ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে এসব চক্র ‘সহজ উপায়ে স্থায়ী হওয়ার’ প্রলোভন দেখাচ্ছে। এমনকি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ভুয়া গল্প তৈরি, প্রমাণ সাজানো, সহায়ক চিঠি বা নথিপত্র প্রস্তুতের পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এ বিষয়ে সতর্ক করে জানিয়েছে, কেবল নিবন্ধিত ও অনুমোদিত পরামর্শদাতাদের মাধ্যমেই অভিবাসনসংক্রান্ত সেবা নেওয়া উচিত। অন্যথায় আবেদনকারীরা গুরুতর আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঘটনা নতুন নয়। অতীতে ইংরেজি ভাষা পরীক্ষায় জালিয়াতি, ভুয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি দেখানো, কাগুজে বিয়ে, ভুয়া চাকরির স্পনসরশিপ এবং জাল নথিপত্র ব্যবহারের মতো নানা ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় সরকার একাধিকবার অভিযান চালিয়ে বহু আবেদন বাতিল করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কেয়ার ভিসা নিয়েও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে দালাল চক্রের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে Downing Street জানিয়েছে, অভিবাসন আবেদন যাচাইয়ে কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।
UK Home Office থেকেও সতর্ক করা হয়েছে, ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে অভিবাসন সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবেদন বাতিলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
অভিবাসন–বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী মনোয়ার হোসেন বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও তথাকথিত ইমিগ্রেশন পরামর্শদাতার কারণে পুরো ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধনহীন পরামর্শদাতারা অর্থের বিনিময়ে আবেদনকারীদের ভুল পথে পরিচালিত করছেন।
তার মতে, এসব কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন প্রকৃত আবেদনকারীরা। অনেকেই বিপুল অর্থ ব্যয় করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হচ্ছেন, ফলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আইনি ঝুঁকিতেও পড়ছেন।
তিনি আরও বলেন, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা অননুমোদিত বা অবিশ্বস্ত পরামর্শদাতাদের ফাঁদে না পড়েন।