জীবনের কিছু মুহূর্ত থাকে যখন সময় যেন কিছুটা থমকে দাঁড়ায়। মানুষ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়, যা একসময় কেবল কল্পনাই করা যেত, আর তখনই পেছনের দীর্ঘ পথচলা এবং ফেলে আসা বছরগুলো কথা বলতে শুরু করে। সম্প্রতি লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন উৎসবে লাল গালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে এসে নিজের এমএসসি (MSc) ডিগ্রি গ্রহণের সময় এমনই এক আবেগঘন মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছিলেন অনুপ সরকার। সামনে ছিল বর্ণিল সমাবর্তন উৎসব, আর পেছনে ছিল একটি পুরো জীবনের সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও অর্জনের ইতিহাস।
সম্প্রতি নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করা এক দীর্ঘ ও হৃদয়স্পর্শী স্ট্যাটাসে নিজের এই পথচলার গল্প তুলে ধরেছেন অনুপ সরকার।
নিজের এই অর্জনকে কেবল একটি একাডেমিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন না অনুপ। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর বংশের মধ্যে তিনিই প্রথম বিদেশে গিয়ে কোনো ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং সম্ভবত তাঁর গ্রাম থেকেও কেউ এই নির্দিষ্ট মাইলফলকে এর আগে পৌঁছাতে পারেননি। নিজেকে বড় করে না দেখিয়ে বরং তিনি প্রকাশ করেছেন গভীর কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ।
নিজের সাফল্যের শেকড় সম্পর্কে বলতে গিয়ে অনুপ স্মরণ করেছেন তাঁর বাবা-মাকে। তাঁদের ত্যাগ, প্রার্থনা, ধৈর্য এবং নিঃশর্ত ভালোবাসাই তাঁর জীবনের পথপ্রদীপ বলে উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের প্রতিটি শিক্ষককে—প্রাথমিক থেকে শুরু করে হাই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অধ্যাপককে, যারা তাঁকে কেবল পড়াশোনাই নয়, শিখিয়েছেন শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনবোধ।
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে বিএ এবং এমএ সম্পন্ন করা অনুপ মনে করেন, শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় শেষ হয় না। তাঁর জীবনের অন্যতম অর্থপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে রয়েছে তাঁর প্রিয় “এমসি কলেজ” (MC College)। ক্লাসরুম, করিডোর আর বন্ধুদের আড্ডায় গড়া সেই চত্বর তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।
পাশাপাশি, থিয়েটারকে নিজের হৃদয়ের ও আত্মার বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। “একদল ফিনিক্স”-এর সাথে যুক্ত হয়ে অভিনয়, গান এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া তাঁর জীবনে শৃঙ্খলা, সাহস, সহানুভূতি ও ধৈর্য এনে দিয়েছে বলে তিনি জানান। দীর্ঘ চুল রাখা বা ফটোগ্রাফি করা নিয়ে সমাজের কিছু মানুষের ভ্রুক্ষেপ বা সমালোচনার পরও তিনি থেমে থাকেননি; বরং ফটোগ্রাফির মাধ্যমে খুঁজে নিয়েছেন গল্প, মুখাবয়ব ও আলোর প্রতি ভালোলাগা।
দেশে থাকা অবস্থায় ফুলটাইম প্রফেশনাল এবং ইভেন্ট প্ল্যানার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ফটোগ্রাফার, আইইএলটিএস মেন্টর এবং ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেছেন অনুপ। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই যাত্রায় পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। চারপাশের নানা প্রতিবন্ধকতা ও ভাঙাগড়ার মধ্যেও তাঁর পরিবার, বিশেষ করে তাঁর বোন ও চাচা শিশির রঞ্জন তালুকদার ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস।
এছাড়া তাঁর জীবন মেন্টর আহ্নাফ আহমেদ আবীরের দিকনির্দেশনা তাঁর পেশাদারিত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং বুদ্ধিমত্তাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলে তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। যুক্তরাজ্যে আসার পর হোইমন্তী চৌধুরী দিদি এবং বিষ্ণু দাস দাদার মতো মানুষের আন্তরিকতা নতুন দেশটিকে তাঁর কাছে পরিচিত করে তুলেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার পঙক্তিমালা টেনে অনুপ তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন ভবিষ্যতের অদম্য কৌতূহল ও এগিয়ে চলার প্রত্যয়। লাল গালিচার এই সংবর্ধনা তাঁর জীবনের শেষ নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা মাত্র।
স্ট্যাটাসের শেষে নিজের মা-বাবা, বোন, শিক্ষক, মেন্টর এবং এমসি কলেজের স্মৃতিকে সম্বল করে অনুপ লিখেছেন:
“জীবন ছোট। রাস্তা লম্বা। এবং ভবিষ্যৎ এখনও লেখা হয়নি। তাই আমি শিখতে থাকব। স্বপ্ন দেখতে থাকব। কাজ করে যাব। অবদান রেখে যাব।”
যেকোনো মানুষের জীবনেই হার না মানা জেদ এবং কঠোর পরিশ্রম কীভাবে সাফল্যের লাল গালিচায় পৌঁছে দিতে পারে, অনুপ সরকারের এই গল্প তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।









