শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে এক নজিরবিহীন আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েছে বিশ্বের শীর্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক। এই তিন প্ল্যাটফর্মের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা, অ্যালফাবেট ও বাইটড্যান্সের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাকে মার্কিন বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এএফপির খবরে জানা যায়, স্থানীয় সময় সোমবার (২৬ জানুয়ারি) লস অ্যাঞ্জেলসে মামলাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের করা হয়। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) থেকে শুরু হচ্ছে জুরি নির্বাচন। বিচারক নিয়োগ সম্পন্ন হলে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বিচারপতি ক্যারোলিন কুলের আদালতে মামলার শুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যা শিশু ও কিশোরদের আসক্ত করে তোলে। এর ফলে অনেক তরুণ অবসাদ, খাবারে অনীহা, গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। মামলায় বাদী হিসেবে যুক্ত আছেন হাজারো ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার।
এই মামলার রায় যদি বিবাদীদের বিরুদ্ধে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একই ধরনের আরও অসংখ্য মামলা দায়েরের পথ খুলে যাবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি মেটার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হতে পারে বলেও আলোচনা চলছে।
মামলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ১৯ বছর বয়সী এক মার্কিন নারী, যাঁর পরিচয় গোপন রাখতে নামের আদ্যাক্ষর ‘কে জি এম’ ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তির কারণে তিনি গুরুতর মানসিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের অভিযোগে সরাসরি সমাজমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আদালতের বিচার শুরু হওয়া এটিই প্রথম ঘটনা।
সোশাল মিডিয়া ভিক্টিমস ল সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথু বার্গম্যান বলেন, শিশুদের ক্ষতির অভিযোগে এত বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হওয়া একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তাঁর নেতৃত্বাধীন আইনজীবী দল বর্তমানে এ ধরনের প্রায় এক হাজার মামলার প্রতিনিধিত্ব করছে।
বার্গম্যান জানান, এই মামলাগুলো পরিচালনায় ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত আইনি কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে। সে সময় ‘ত্রুটিপূর্ণ পণ্য’ বিক্রির অভিযোগ এনে সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সফল মামলা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “আমরা স্বীকার করি, এই মামলা জেতা সহজ নয়। আমাদের প্রমাণ করতে হবে—এই প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা শিশুদের মানসিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। সেই দায়িত্ব আমরা সচেতনভাবেই নিয়েছি।”
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে একই ধরনের অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ন্যাপচ্যাট আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি করেছে। তবে চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ করা হয়নি।
বিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, মার্কিন যোগাযোগ নৈতিকতা আইনের ২৩০ ধারা অনুযায়ী ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা কনটেন্টের জন্য তারা দায়ী নয়। তবে বাদীপক্ষের যুক্তি, মামলাটি কনটেন্টের দায় নয়, বরং প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম ও নকশাগত কাঠামো নিয়ে—যা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহারকারীদের মনোযোগ আটকে রেখে মানসিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়।
ইতোমধ্যে ক্যালিফোর্নিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফেডারেল আদালতে একই ধরনের অভিযোগে আরও মামলা দায়ের হয়েছে। তবে এই মামলার বিষয়ে মেটা, অ্যালফাবেট ও বাইটড্যান্স এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।