এক সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শেষে দরজা বন্ধ হয়ে যেত যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ মসজিদে। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, চুরি কিংবা উগ্রবাদী হামলার আশঙ্কাই ছিল এর প্রধান কারণ। কিন্তু সময় বদলেছে। ২০২৬ সালে এসে ব্রিটেনের মসজিদগুলো শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং ব্রিটিশ মুসলিমদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার এক গুরুত্বপূর্ণ ভরসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনের ২ হাজার ১৬৪টি মসজিদের প্রায় সবকটিতেই নামাজ শেষে তালা দেওয়ার রীতি চালু ছিল। তবে নতুন প্রজন্মের দূরদর্শী মুসলিম নেতৃত্ব সেই চর্চা ভেঙে দিয়েছে। এখন অনেক মসজিদ সারাদিন খোলা থাকছে—কখনো স্বাস্থ্যসেবা, কখনো মানসিক সহায়তা, আবার কখনো সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে।
ব্র্যাডফোর্ডের জামিয়া ওসমানিয়ার মতো মসজিদগুলো এই পরিবর্তনের প্রতীক। সেখানে ইবাদতের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ফিটনেস কার্যক্রম, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও সামাজিক কাউন্সেলিং। এর মাধ্যমে প্রমাণ হচ্ছে—মসজিদ কেবল সেজদার স্থান নয়, সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ও সমাজ গঠনেরও কেন্দ্র।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ৪৪ লাখের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ড মিলিয়ে মসজিদ রয়েছে ১ হাজার ৮৯৩টি। গড়ে প্রতিটি মসজিদের ওপর দায়িত্ব পড়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মুসল্লির। এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত, যাদের মধ্যে শারীরিক অসুস্থতা ও একাকীত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এশীয় পুরুষদের প্রায় ৬০ শতাংশই প্রয়োজনীয় মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম করেন না। এই স্বাস্থ্যঘাটতি মোকাবিলায় মসজিদগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। পরিচিত ধর্মীয় পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ায় মুসল্লিদের অংশগ্রহণও তুলনামূলক বেশি হচ্ছে।
এই রূপান্তরের পেছনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুসলিম এই সামাজিক উদ্যোগের অগ্রভাগে রয়েছেন। হাজার হাজার বাংলাদেশি ও ব্রিটিশ-বংশোদ্ভূত ইমাম এখন খুতবায় ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি সামাজিক সংহতি, একাকীত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরছেন।
টাওয়ার হ্যামলেটস থেকে শুরু করে ব্র্যাডফোর্ড—বাংলাদেশি পরিচালিত বহু মসজিদ কার্যত স্থানীয় কাউন্সিলের বিকল্প সেবাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সরকারি সেবার পরিসর যখন সংকুচিত, তখন ইমাম ও মসজিদ কমিটিগুলোই অনেক মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠছে।
এই ‘ব্রিটিশ মডেল’ বাংলাদেশের পাঁচ লাখের বেশি মসজিদের জন্যও হতে পারে কার্যকর অনুকরণীয় উদাহরণ। বাংলাদেশ সরকার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন চাইলে বড় ধরনের বাজেট ছাড়াই মসজিদগুলোকে কমিউনিটি হাবে রূপান্তর করতে পারে। নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে বয়স্কদের জন্য হালকা ব্যায়াম, ইমাম প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
সদিচ্ছা থাকলে প্রতিটি গ্রামের মসজিদ ধাপে ধাপে ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং বা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে।
জায়গার সংকট সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যের অনেক মসজিদ সৃজনশীল সমাধান খুঁজে নিয়েছে। আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন থেকে রূপান্তরিত এসব মসজিদে ‘ওয়েলনেস টুলকিট’ ব্যবহার করে নামাজের বিরতিতে মূল হলরুমে হালকা ব্যায়াম, বেজমেন্টে চেয়ার এক্সারসাইজ কিংবা ছোট পরিসরে মানসিক স্বাস্থ্য আলোচনা আয়োজন করা হচ্ছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সিসিটিভি ও স্বেচ্ছাসেবক ‘শান্তি রক্ষী’ নিয়োগের মাধ্যমে নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হচ্ছে, যাতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ নির্বিঘ্ন হয়। এই পদ্ধতি বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও কার্যকর হতে পারে।
লন্ডনের সাউথ উডফোর্ড ইসলামিক সেন্টারের ইমাম মাওলানা নাজমুল হক বলেন, মসজিদভিত্তিক এই স্বাস্থ্য উদ্যোগ কোনো আধুনিক উদ্ভাবন নয়; বরং এটি সুন্নাহরই বাস্তব প্রয়োগ। তিনি হাদিস উদ্ধৃত করে বলেন, “নিশ্চয়ই তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে” (বুখারি)। আবার সহীহ মুসলিমে এসেছে, “দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।”
কুরআন ও সুন্নাহর এই শিক্ষাই প্রমাণ করে—শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা মুসলমানের ইবাদতেরই অংশ। যখন একটি মসজিদ একাকীত্ব কমায় বা অসুস্থতার ভার লাঘব করে, তখন তা মূলত মদিনার মসজিদের আদর্শকেই নতুন বাস্তবতায় জীবন্ত করে তোলে।