বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব এবার পড়েছে সুদূর যুক্তরাজ্য–এর অভিবাসন আদালতগুলোতে। সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী কয়েক হাজার বাংলাদেশি ও তাদের পরিবার পড়েছেন চরম আইনি অনিশ্চয়তায়।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোটের বড় জয় এবং প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর উত্থান এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্ষমতার পালাবদলের ফলে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর বিএনপি ও জামায়াত সমর্থক দাবি করে আশ্রয় চাওয়া বাংলাদেশিদের আবেদন নতুন করে কঠোরভাবে পর্যালোচনা শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের মূল ভিত্তি হলো নিজ দেশে রাজনৈতিক কারণে ‘সুনির্দিষ্ট নিপীড়নের আশঙ্কা’। গত দেড় দশকে বহু বাংলাদেশি দাবি করেছিলেন, বিএনপি বা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তারা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এখন সেই দলগুলোই রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির যুক্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আইনজীবীদের মতে, যে পক্ষকে আগে ‘নিপীড়িত’ বলা হতো, তারা এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে বলে বিবেচিত হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের অভিবাসন বিধির ৩৩৯এ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তির নিজ দেশের পরিস্থিতিতে মৌলিক ও স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে এবং তার আর সুরক্ষার প্রয়োজন না থাকে, তবে তার শরণার্থী মর্যাদা বাতিল করা যেতে পারে। একইভাবে ১৯৫১ সালের শরণার্থী সনদের অনুচ্ছেদ ১সি (৫) বলছে, যে পরিস্থিতির কারণে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল তা আর বিদ্যমান না থাকলে সেই মর্যাদা বহাল থাকে না।
লন্ডনের প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার সালাহ উদ্দিন সুমন বলেন, “আপনার দলের শীর্ষ নেতা যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের আশঙ্কার যুক্তি আদালতে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যায়।” তার মতে, যাদের আবেদন এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ সালেও যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনকারী শীর্ষ পাঁচ দেশের একটি ছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে মোট ৭ হাজার ২২৫ জন বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাপক হারে আবেদন বাতিল বা বিতাড়ন কার্যক্রম শুরুর আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই ধরনের আইনি জটিলতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতেও। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মে মাসে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো নিয়ে ঢাকা ও লন্ডনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, যা এখন দ্রুত কার্যকর হতে পারে।
যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকৃত নির্যাতিত নেতাকর্মীদের তারা সহযোগিতা করেছেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটি তাদের এখতিয়ার।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ইউরোপের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা দাবি করেন, প্রতিটি মামলার নিজস্ব ভিত্তি রয়েছে। তার বক্তব্য, ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও দলীয় নেতাকর্মীদের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
এদিকে ভিন্ন এক চিত্রে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ শতাধিক নেতাকর্মীও যুক্তরাজ্যে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তাদের অনেকের আবেদন ইতোমধ্যে অনুমোদন করেছে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ।